সর্বশেষ
7 Aug 2026, Fri

স্বরূপ সন্ধানে বাউল সুনীল

-আ.ফ.ম.রফিকুল ইসলাম খান আপেল

বাউল সুনীল কর্মকার।তিনি সুনীল বাউল নামেও খ্যাত। বৃহত্তর ময়মনসিংহে শুধু নয়,সারা বাংলায় বিখ্যাত নাম বাউল সুনীল কর্মকার। তিনি দেশের বাইরেও বাউল সংগীতে সুনাম কুড়িয়েছেন। লোকসংস্কৃতির জনপদ নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার বান্দনাল গ্রামে দীনেশ সরকার ও কমলা সরকারের ঘরে এক যুগেরও বেশি তপস্যায় সুনীল কর্মকার ১৫ জানুয়ারি ১৯৫৯ সনে জন্ম নেন। কিন্তু বিধিবাম জন্মেই তার দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক ছিল না। সময়ের বৈরিতায় বাল্যকালে একাধিকবার টাইফয়েডেও আক্রান্ত হন।তার দুই নয়ন স্বাভাবিক না হলেও তার দৈবশক্তি গানে লাভ করেন এবং শ্রবণশক্তিও ছিল প্রখর। একবার যা শুনতেন তা তিনি মুখস্ত করে নিতেন। যুক্তি তর্কেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তার কণ্ঠস্বর ছিল খুবই সুরেলা ও ভারী। তিনি গানের প্রতিটি শাখায় অবাধ বিচরণ করতে পারতেন। তার বিচ্ছেদ অঙ্গের গান ও টপ্পাগান মানুষ তন্ময় হয়ে শুনতেন।

বাল্যকালে বাউল সাধক জালাল উদ্দিন খাঁর দ্বিতীয় শিষ্য বাউল ইস্রাফিলের নজরে আসেন সুনীল কর্মকার। তিনি সযত্নে তাকে বাউলের বিভিন্ন ধারায় শিক্ষাদান করেন। এতে সুনীল কর্মকার বাউল গানে বেশ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। স্বশিক্ষা ও ওস্তাদের শিক্ষার মেলবন্ধনে এই গুণী বাউল হয়ে ওঠেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রাণের মানুষ।

সুফি-সহজিয়া-বৈষ্ণব ভাবধারার সংমিশ্রণে তিনি যে গান পরিবেশন করতেন,শ্রোতাগণ সেই গানে একত্ব হয়ে যেতেন। বাউল সত্তার প্রতিটি স্তরে তার অবাধ বিচরণ ছিল।

০৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ সনে শিকড় উন্নয়ন কর্মসূচির ২৭ সদস্য দলের সদস্য হিসেবে বাউল সুনীল প্রথমবার বিদেশ সফর হিসেবে ভারতে যান। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আমন্ত্রণে দুদিন বাণীপুর মেলায় তিনি বিচ্ছেদ অঙ্গের উকিল মুন্সির গান গেয়ে উপস্থিত দর্শকদের প্রশংসা কুড়ান।

৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ তারিখে কলকাতার সল্টলেকে, রাজ্য সরকারের অধীন লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আয়োজিত “ময়মনসিংহ গীতিকা অঞ্চল নেত্রকোণা” বিষয়ক কর্মশালায় রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ পবিত্র সরকার, রাজ্য সরকারের বনমন্ত্রী শ্রী যুগেশ বর্মন, কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিজীবী ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক গণনাট্য আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সুধী প্রধান ( তৎক্ষণিন সময় তার বয়স ছিল ৯৩ বছর) সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও ছাত্রছাত্রীরা এতে অংশ নেন এবং বিষয়ভিত্তিক ছাত্র-ছাত্রীরা প্রশ্ন রাখেন।

আমরা প্রথমেই দলীয়ভাবে শিকড়ের বন্ধনা গীত বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন রচিত “মানুষ ধরো মানুষ ভজ শোন বলিরে পাগল মন” পরিবেশন করি। শ্রোতাদের মধ্যে একজন প্রশ্ন রাখেন এই গানটি বাউলের কোন অঙ্গের বা কোন ধারার? তখন বাউল সুনীল কর্মকার কর্মশালার মঞ্চে উঠে পরিবেশিত গানের ব্যাখ্যা দেন যে, এই গানটি রূপ থেকে স্বরূপ সাধনা অঙ্গের। আমরা বাউলরা মনে করি, রূপ হলো বাইরের ব্যাপার আর রূপের অন্তর্নিহিত সত্তার নাম স্বরূপ। একজন সার্থক বাউল সাধক, সাধনার মাধ্যমে রূপ থেকে স্বরূপে সন্ধান লাভ করতে পারেন। সাধক রশিদ উদ্দিন এই গানে মানুষের ভিতরে যে মানুষটি বাস করে তাকে খোঁজার কথা বলেছেন। সেই মানুষটি হলো পীর বা গুরু। তাদের সাধনলব্ধ গুণাবলী নিজের সাধনার মাধ্যমে আত্মস্থ করে অন্তর্নিহিত আত্মাকে পরিশুদ্ধ করাকেই স্বরূপ সাধন বলে।

ময়মনসিংহে গীতিকা অঞ্চল নেত্রকোণার শিল্পকলার বিভিন্ন শাখায় কর্মশালায় পরিবেশিত আঙ্গিকের বিষয় সমূহ নিয়ে উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নে স্ব-স্ব আঙ্গিকের শিল্পীরা তার ব্যাখ্যা দেন। যেমন- শিলুক, মেয়েলি গীত, বিয়ের গান, কিসসা পালা পরিবেশনের মধ্যদিয়ে বেলা তিনটা অবধি কর্মশালা চলে। একই দিনে সন্ধ্যা ছয়টা ত্রিশ মিনিটে শিশির মঞ্চে রাজ্য সরকারের আয়োজিত পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চল নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতি অনুষ্ঠানে বাউল সুনীল কর্মকার, বাউল সিরাজ উদ্দিন খান পাঠান ও ইলা বিশ্বাস বাউল গান পরিবেশন করেন। রাসেল শিলুক, রতন ও নারায়ন ঘাটু গান এবং পরিশেষে কুদ্দুস বয়াতির কিচ্ছাপালা উপস্থিত শ্রোতা দর্শকদের মন জয় করে। এতে বাউল সুনীল কর্মকারের দোতারা সবার মনে আলাদাভাবে প্রশংসা কুড়ায়।

১৩ মার্চ ১৯৯৭ সনে বেলা ১২:৩০ মিনিটে কলকাতা দূরদর্শন হতে শিশির মঞ্চের অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়। সুনীল কর্মকার আমাদের পরিবেশিত অনুষ্ঠানটি শুদ্ধতার দিকে নিজে দায়িত্ব নিয়ে সম্পূর্ণ করেন। তারই জন্য আমরা কলকাতাবাসীর নিকট প্রশংসিত হই।

সুনীল কর্মকার সনাতন গোত্রে জন্ম নিয়ে, বাউল সাধনায় লিপ্ত হয়ে- একেশ্বরবাদ বিশ্বাসী, বৈষ্ণব, সহজিয়া, সুফি মতবাদে লব্ধজ্ঞানে একজন মানুষ হয়ে ওঠেন। তিনি মনে করতেন, পারঘাটা তত্ত্বের দুইটি পার, প্রথমটি হল- মাতৃগর্ভ হতে ব্রহ্মাণ্ডে আগমন, দ্বিতীয়টি হল- ব্রহ্মাণ্ড হতে পরপারে যাওয়া। এই আসা-যাওয়ার মাঝে যতক্ষণ প্রাণায়াম শক্তি আছে ততক্ষণই সে প্রকৃত ‘মানুষ’। এমনিভাবে বাউল সুনীল সত্য সুন্দর ও মঙ্গলের সেবায়েত হয়ে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠেন।

বাউল সাধক সুনীল কর্মকার ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভোর ৪ঃ৩০ মিনিটে পরপারে উদ্দেশ্যে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে গৌরীপুর উপজেলার কলতাপাড়া গ্রামে তার দীক্ষাগুরু বৈষ্ণব মদন মোহন গোস্বামীর কবরের পাশে তাঁর নিজ ক্রয়কৃত জমিতে সর্বধর্মের মানুষের ভালোবাসায় তাকে সমাহিত করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *